কোনোভাবেই করোনার লাগাম টানতে পারছে না ইউরোপ

প্রকাশিত: ৪:০৬ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২১, ২০২০

লকডাউন আর কারফিউ ছাড়াও অন্যান্য বিধিনিষেধ জারির পরও কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণে আসছে না ইউরোপের করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি। প্রতিনিয়ত অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশে বেড়েই চলছে মহামারি এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। একই সঙ্গে প্রতিনিয়ত সমানুপাতিক হারে বাড়ছে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে প্রাণহানিও।

গত ৩১ জানুয়ারি ইতালির রাজধানী রোমে দুজন চীনা পর্যটকের শরীরে করোনার উপস্থিতি শনাক্ত হয়। যদিও অনেকের মতে ইউরোপে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ২১ জানুয়ারি; ফ্রান্সের বোর্দো নামক স্থানে। এর দেড় মাস ১৭ মার্চের মধ্যে ইউরোপের প্রায় সব দেশে ছড়িয়ে পড়ে প্রাণঘাতী এই করোনাভাইরাসের প্রকোপ।

রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন এবং ফ্রান্স; ইউরোপের এ পাঁচ দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং একই সঙ্গে মৃত্যুর হার ছিল ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। আর প্রতি লাখে মৃত্যুহার বিবেচনায় শীর্ষে ছিল বেলজিয়াম। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও রেহাই পাননি করোনার ছোবল থেকে।

ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউন হয় সুইডেন ছাড়া ইউরোপের প্রায় সব দেশ । মে মাসের মাঝামাঝি বিভিন্ন দেশে রোগীর সংখ্যা কমতে শুরু করে। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করে গোটা ইউরোপ। এই মার্চ থেকে জুন সময়কালকে ইউরোপে করোনার প্রথম দফার সংক্রমণ (ফার্স্ট ওয়েভ) হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

তবে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু করে আগস্টের প্রথম দিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ফের ভাইরাসটির প্রকোপ বাড়তে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা ইউরোপে করোনা সংক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ। মূলত লকডাউন শিথিল পরবর্তী সময়ে এবং একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সীমান্ত সংযোগ স্বাভাবিক করার পর মানুষের অবাধ যাতায়াত বৃদ্ধিকে দ্বিতীয় দফায় ইউরোপে করোনা সংক্রমণের প্রাথমিক কারণ হিসেবে বলা হয়।

Europe-1

বিবিসি, ডয়েচ ভেলে, এসটিএসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের জরিপে দেখা গেছে, লকডাউন চলাকালীন ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষের মাঝে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার বিষয়ে যে রকম সচেতনতা ছিল, লকডাউন শিথিলের পর তেমনটি আর দেখা যায়নি। এ ছাড়া গ্রীষ্মকালীন অবকাশকে কেন্দ্র করে সমুদ্রসৈকতসহ বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে মানুষের সমাগম অধিক হারে বেড়ে যাওয়াকেও ইউরোপে দ্বিতীয় দফায় করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধির আরও একটি প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে।

তবে দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে অনেকে বলকান দেশগুলোকে দায়ী করেন। পশ্চিম তুরস্কে অবস্থিত ‘ইস্টার্ন থ্রেস’ থেকে শুরু করে বুলগেরিয়া, গ্রিস, মেসিডোনিয়া, আলবেনিয়া, সার্বিয়া, কসোভো, মন্টিনিগ্রো, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, ক্রোয়েশিয়া, হাঙ্গেরি ও রোমানিয়ার সামান্য অংশকে সম্মিলিতভাবে বলকান নামে ডাকা হয়। স্থানীয় বলকান পর্বতমালার নাম অনুসারে এ অঞ্চলের নাম রাখা হয়েছে বলকান।

সাধারণ মানুষ যেভাবে ইউরোপকে সংজ্ঞায়িত করে বলকান অঞ্চলগুলো তার চেয়ে একেবারে ভিন্ন। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় বলকান দেশগুলোর অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। দুর্নীতি ও অপরাধপ্রবণতার মাত্রাও এ দেশগুলোতে বেশি। গত জুন থেকে গোটা ইউরোপে যখন করোনার সংক্রমণ অনেকটা কমে এসেছিল সে সময় এ সব দেশে করোনার সংক্রমণ কিছুটা বেশিই ছিল।

তাই গোটা ইউরোপে যখন সীমান্ত সংযোগ পুনরায় স্বাভাবিক করার ঘোষণা দেয়া হয়, তখন বলকানের দেশগুলো বিশেষ করে সার্বিয়া, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, মেসিডোনিয়া, ক্রোয়েশিয়া থেকে মানুষের অবাধ যাতায়াতের ফলে ইউরোপের অনেক দেশে ফের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

স্লোভেনিয়া, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড এমনকি জার্মানিতেও দ্বিতীয় দফায় যখন ভাইরাসটির সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে, তখন প্রথম দিকে এ সব দেশে শনাক্ত হওয়া কোভিড-১৯ রোগীর অনেকেই ছিলেন সার্বিয়া, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, মেসিডোনিয়া, ক্রোয়েশিয়ার মতো দেশগুলোর অভিবাসী।

গ্রীষ্মকালীন অবকাশের জন্যও অনেকের পছন্দের তালিকায় স্থান পায় ক্রোয়েশিয়ার সমুদ্রতীরবর্তী রিসোর্টগুলো। তাই অবকাশ যাপন শেষে অনেকে যখন ক্রোয়েশিয়া থেকে নিজ নিজ দেশে আবার ফিরতে শুরু করেনে তখন তাদের মধ্যে অনেকের শরীরে কোভিড-১৯ এর উপস্থিতি শনাক্ত হয়।

প্রথম দফায় ইউরোপে করোনা মহামারি মোকাবিলায় দুটি সফল দেশ মন্টিনিগ্রো ও স্লোভেনিয়া। গত ১৫ মে ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে করোনার অবসানের ঘোষণা দেয় স্লোভেনিয়া। মার্চ থেকে শুরু করে মে মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত যেখানে দেশটিতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিলো ১ হাজার ৪০০ এর কিছু বেশি সেখানে এখন প্রতি দিন গড়ে দেড় হাজার মানুষ ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হচ্ছেন।

অপরদিকে গত ২৩ মে ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে মন্টিনিগ্রো করোনা জয়ের ঘোষণা দেয়। এ সময় দেশটিতে নতুন করে আক্রান্ত কিংবা মৃতের সংখ্যা একেবারে শূন্যে নেমে এসেছিলো। সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন ভাইরাসে আক্রান্ত প্রায় সবাই। করোনার সেকেন্ড ওয়েভের তাণ্ডবে এ দেশটি এখন রীতিমতো অসহায়।

ছয় লাখ মানুষের এই দেশে প্রতিদিন দিন গড়ে ৪০০ এর বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। ফার্স্ট ওয়েভে করোনা মোকাবিলায় বেশ সফল স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, ক্রোয়েশিয়া, রোমানিয়া ও গ্রিস সেকেন্ড ওয়েভে বিপর্যস্ত। অনেক দেশে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর এমনকি প্যারাসসিটামলেরও সংকট দেখা দিয়েছে।

সেকেন্ড ওয়েভে ইউরোপে করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণে সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি ফ্রান্সের। দেশটিতে প্রতিদিন গড়ে ত্রিশ হাজারের বেশি মানুষের দেহে মহামারি এই ভাইরাস সংক্রমিত কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। গত ৬ নভেম্বর তো একদিনে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৬০ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে দেশটিতে।

ইতালিতে গত ১৭ নভেম্বর দেশটিতে নতুন করে ৩২ হাজার ১৯১ জনের শরীরে নতুন করে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। ব্রিটেন, রাশিয়া, স্পেনের মতো দেশেও গড়ে প্রতিদিন নতুন করে করোনায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এখনও পনেরো থেকে বিশ হাজার। জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, পোল্যান্ড, চেক রিপাবলিক, পর্তুগাল, ইউক্রেনসহ ইউরোপের প্রায় সব দেশেই আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ।

তবে প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিসের গৃহীত কিছু পদক্ষেপের কারণে তুলনামূলকভাবে ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় এখনও কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে গ্রিস। এর পরও গত চব্বিশ ঘন্টায় দেশটিতে নতুন করে ৩ হাজার ২৯০ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ৬০ জন।

নমুনা পরীক্ষার বিচারে ইউরোপের প্রায় সব দেশে করোনা সংক্রমণের হার গড়ে ২৫ শতাংশের কাছাকাছি। সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে কিছু দেশ অঞ্চলভিত্তিক জোনভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তুলনামূলক সংক্রমণের হার যে সব অঞ্চলে বেশি সেগুলোকে অঞ্চলকে রেড জোন এবং যে সব অঞ্চলে সংক্রমণের হার একেবারে কম সেগুলোকে গ্রিন কিংবা অরেঞ্জ জোনের আওতাভুক্ত করা হয়েছে।

রেড, গ্রিন কিংবা অরেঞ্জ জোনের মাঝামাঝি রয়েছে ইয়োলো জোন। যেহেতু ইউরোপের দেশগুলো ফার্স্ট ওয়েভের অর্থনৈতিক বিপর্যয় পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি তাই বেশিরভাগ দেশই অর্থনীতির কথা চিন্তা করে নতুনভাবে আবারো লকডাউনের ঘোষণা দিতে চাচ্ছে না। এমনকি এখনও বেশিরভাগ দেশই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সীমান্ত সংযোগ চালু রেখেছে; পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি ফ্লাইটও।

অনেক জায়গায় লকডাউনবিরোধী বিক্ষোভও করেছে মানুষ। স্লোভেনিয়ার মতো ইউরোপের কিছু দেশ সম্পূর্ণ লকডাউন হলেও বেশিরভাগ দেশই মহামারি করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়সীমাকে বেছে নিয়েছে লকডাউন কিংবা কারফিউ বহাল রাখার জন্য।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ফের গণপরিবহন থেকে শুরু করে জনসমাগস্থলগুলোতে মাস্ক বাধ্যতামূলক ছাড়াও কোনো নির্দিষ্ট স্থানে একসঙ্গে অধিক মানুষের সমাগম নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু কোনও পদক্ষেপই এ মুহূর্তে কাজে আসছে না, বরং শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে করোনার সংক্রমণ।